সাহিত্য মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, কল্পনা এবং অভিজ্ঞতার এক সৃজনশীল প্রকাশ; এটি জীবনেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে, রাজনীতি মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সাহিত্যকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত করা স্বাভাবিক। সাহিত্য স্বভাবতই নান্দনিক ও মার্জিত, পক্ষান্তরে রাজনীতি প্রায়শই জাগতিক ঝঞ্ঝাট ও জটিলতায় পরিপূর্ণ। এ কারণে অনেকেই সাহিত্যে রাজনীতির অনুসন্ধানের পক্ষপাতী নন। কিন্তু তাই বলে সাহিত্য ও রাজনীতিকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। যুগে যুগে অসংখ্য সাহিত্যিক রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন; ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের সাহিত্যকর্ম শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতাকে সুসংহত করতেও ভূমিকা রেখেছে।
পৃথিবীতে সাহিত্যের বহু ধারার উত্থানে রাজনীতি প্রায়শই পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তাকে প্রভাবিত করেছে। উনিশ শতকের শেষার্ধে একাডেমিক অঙ্গনে ইংরেজি সাহিত্যের প্রবেশে রাজনীতির বিরাট ভূমিকা ছিল। সে সময় বিশ্বব্যাপী সেকুলারিজমের বা ইহজাগতিকতার উত্থানের ফলে ‘মোরাল অথোরিটি’ বা নৈতিক কর্তৃত্ব হিসেবে ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। এই শূন্যতার প্রেক্ষাপটে সাহিত্য মানবসমাজে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ সঞ্চারের কার্যকর হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়। প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্য সমালোচক টেরি ঈগলটন তাঁর ‘দ্য রাইজ অফ ইংলিশ’ (The Rise of English) প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্য কেবল শিল্পসত্তার প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের এক কৌশলগত মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল। ঈগলটনের মতে, সাহিত্য রচনার মাধ্যমে জনসাধারণকে এর নান্দনিকতার আকর্ষণে আবদ্ধ রেখে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা হতো। কবিতা, গল্প ও নাটক পড়ে পাঠক যেন ক্ষমতাকে প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করার কথা ভুলে যায়, সেই বন্দোবস্তই করা হয়েছিল। তৎকালীন মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সাহিত্যচর্চায় ব্যস্ত রেখে শাসকরা নিজেদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতেন। ফলে সাহিত্যিক জাগরণের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তৎকালীন ইউরোপের শ্রেণি-বৈষম্য ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রকৃত চিত্র।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ইউরোপীয়রা সমগ্র পৃথিবীতে উপনিবেশ স্থাপন করছে, ঠিক তখনই ইংরেজি সাহিত্যে রোমান্টিসিজমের আবির্ভাব ঘটে। উপনিবেশগুলোতে যখন ইউরোপীয়দের শাসন ও নিষ্পেষণ চলছে, তখন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের মতো রোমান্টিক কবিরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লেখায় মগ্ন। রোমান্টিকরা মূলত প্রকৃতি, আবেগ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাকে তাঁদের কবিতায় প্রাধান্য দিয়েছেন। কলোনিগুলোতে ইউরোপীয়দের নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থা নিয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো রোমান্টিক কবিরা তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। আবেগ, কল্পনা কিংবা প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা দ্বারা তাড়িত হলেও তাঁদের ভাবনায় সামাজিক অসংগতির বিষয়গুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থেকেছে। বিশেষ করে ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতিপ্রেমের কবিতাগুলো (যেমন: ‘I Wandered Lonely as a Cloud’, ‘Tintern Abbey’, ‘The Solitary Reaper’) সমকালীন রাজনৈতিক সংঘাতকে পাশ কাটিয়ে পাঠকদের মাঝে শান্তির বাণী প্রচার করেছে। এর মাধ্যমে ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকারান্তরে শাসকশ্রেণির সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কাজেই সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। আরেক রোমান্টিক কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ প্রথমদিকে বিপ্লবপন্থী হিসেবে নিজেকে হাজির করলেও পরবর্তীকালে রক্ষণশীল অবস্থান নেন। তাঁর কবিতা আধ্যাত্মিকতা ও নির্জনতার কথা বললেও, এই অতি-আধ্যাত্মিকতা পাঠকদের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও শাসকশ্রেণির অসংগতি থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়।
ইংরেজি সাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যকে অনেক ক্ষেত্রে অধিক রাজনৈতিক বলা যায়। বাংলা সাহিত্যের বহু লেখকের রচনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। সাহিত্যিকরা কখনো কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেন; বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করতেও দেখা যায় অনেককে। আবার কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই শোষিত-নিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে পরিণত হন, সমাজের উঁচু স্থান থেকে নেমে আসেন জনতার কাতারে। ঔপনিবেশিক বাংলায় অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁদের লেখায় উপনিবেশের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করে ইংরেজদের সুদৃষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেছেন। জাগতিক সুবিধা লাভের আশায় ঔপনিবেশিক শাসনকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সাহিত্যিক রসদ জুগিয়েছেন অনেকেই।
রাজা রামমোহন রায়কে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মনে করা হয়। সমাজ সংস্কারক হিসেবে খ্যাত রামমোহন ব্রিটিশ শাসনকে আধুনিক ‘সভ্যতার বাহক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। একদিকে তিনি লেখনীর মাধ্যমে ব্রিটিশদের সংস্কারমূলক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তির কোনো প্রত্যক্ষ আন্দোলন তিনি সংগঠিত করেননি। রামমোহনের মাঝে ব্রিটিশদের সঙ্গে একপ্রকার রাজনৈতিক আপোষকামী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। ব্রিটিশ শাসনের উপস্থিতিকে তিনি ‘সংস্কার সাধনের সুযোগ’ হিসেবে দেখতেন। রামমোহনের মতো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং দীনেশচন্দ্র সেনরাও তাঁদের লেখার মাঝে এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছেন, যা প্রকারান্তরে ব্রিটিশদের ‘সিভিলাইজিং মিশন’ বা তথাকথিত সভ্য করার দায়ভার তত্ত্বের বাস্তবায়নে সহায়তা করেছিল। বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক লেখক আছেন যারা তাঁদের সাহিত্য রচনার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন।
সাহিত্যের মূলত দুটি ধারা রয়েছে: একটি নান্দনিক এবং অপরটি বিপ্লবী। সাহিত্যের নান্দনিক ধারা সৌন্দর্যের আড়ালে ক্ষমতার স্বার্থ রক্ষা করলেও বিপ্লবী ধারা ঠিক তার বিপরীত। সাহিত্যের বিপ্লবী ধারা বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই ধারা সবসময় গণমানুষের পক্ষে—শোষিত, নির্যাতিত আর পরাধীন মানুষের মুক্তির স্লোগানে পরিণত হয়। ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ উপনিবেশের শিকল থেকে মুক্ত করার ডাক দিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতি ছিল নজরুল-সাহিত্যের অন্যতম চেতনা। ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্পেষণচক্রে পিষ্ট, তখন নজরুল পরাধীনতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন, বললেন স্বাধীনতা ও সাম্যের কথা। তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে উঠল। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় নজরুল লিখলেন—‘আমরা ধ্বংসের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টি চাই।’ এটিই বিপ্লবী রাজনীতির ভাষা। তৎকালীন ভারতের রাজনীতিবিদরা যখন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সীমিত পরিসরে স্বায়ত্তশাসন কিংবা স্বরাজের দাবি নিয়ে দরকষাকষিতে ব্যস্ত, তখন নজরুল তাঁর পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লিখলেন—‘স্বরাজ-টরাজ বুঝি না...।’ এই লেখার মাধ্যমে নজরুল মূলত ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। সাহিত্যের সবচেয়ে চমৎকার রাজনীতি বোধহয় এটাই, যা আমজনতার হৃদয়ের কথা ফুটিয়ে তোলে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, ‘দারিদ্র্য’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’—এসব সাহিত্যকর্মে গণমানুষের রাজনীতির প্রতিফলন ঘটেছে। শুধু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন নয়; চল্লিশের দশকের পাকিস্তান আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—এসব গণআন্দোলনে সাহিত্য ব্যাপক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। বর্তমানেও রাজনীতি যখন সমাজের সর্বস্তরে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, সাহিত্য সেই রাজনীতি থেকে মুক্ত নয়। তাই মানবসমাজের ইতিহাসে সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক সর্বদা বিরাজমান।
তবে সাহিত্যকে হতে হবে জনতার, কোনো শাসকগোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতার নয়। অপরাজনীতি বা রাজনীতির অপব্যবহার যখন সমাজে বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে ওঠে, সাহিত্যকে অবশ্যই তখন সেই অপরাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিণত হবে নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদের ভাষায়। রাজনীতি যখন সাহিত্যকে গ্রাস করে, কবি-সাহিত্যিকরা যখন ক্ষমতা ও নোংরা রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হন, তখন সাহিত্য তার সৌন্দর্য হারায়। এতে শুধু সাহিত্যের স্বকীয়তা নষ্ট হয় না, বরং এর মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়।
সাহিত্য কেবল নান্দনিকতার আশ্রয় নয়, বরং সমাজ ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক শক্তিশালী মাধ্যম। ইতিহাসে সাহিত্য কখনো শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ার হয়ে ক্ষমতার স্বার্থ রক্ষা করেছে, আবার কখনো নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার আহ্বানে গর্জে উঠেছে। তাই ক্ষমতা ও রাজনীতির জটিলতাকে অতিক্রম করে সাহিত্যকে সবসময়ই সত্য ও ন্যায় প্রকাশের নান্দনিক মাধ্যমে পরিণত হতে হবে।

